বিশ্বকাপ ফুটবলে এবার একাধিক ছোট দেশ চমক দিচ্ছে৷ শনিবার ভোরে বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন আর্জেন্টিনাকে দারুণ বেগ দিয়েছে কেপ ভার্দে৷ এমন স্বল্প পরিচিত, ছোট ছোট দেশ বিশ্ব ফুটবলের সেরা আসরে পৌঁছে গেলেও কোথায় পিছিয়ে পড়ছে ভারতের মতো জনবহুল দেশ?
দেড় লাখ মানুষের দেশ বিশ্বকাপ খেলছে৷ ১৪৭ কোটি মানুষের দেশ কেন বিশ্বকাপে নেই?
ভারত কি কখনো ফিফা বিশ্বকাপে খেলতে পারবে?
ভারতীয় ফুটবল ভক্তদের সেই পরিচিত আক্ষেপ।
যারা বছরের পর বছর ধরে ভারতীয় ফুটবল অনুসরণ করছেন তাদের কাছে এই প্রশ্নটি বড় ক্লিশে। ভারত যে কখনোই বিশ্বকাপ বাছাইপর্বের এশীয় অঞ্চলের প্রাথমিক গণ্ডিই পার হতে পারেনি।
পরিকাঠামোর অভাব, তৃণমূল স্তরে পেশাদারিত্বের ঘাটতি, দুর্বল পরিচালনা ব্যবস্থা এবং দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনার অভাবেই ভারত বিশ্ব ফুটবলে পিছিয়ে আছে। এর পাশাপাশি ক্রিকেটের ব্যাপক জনপ্রিয়তা, কোচিংয়ের অভাব, এবং ভারতীয় বংশোদ্ভূত খেলোয়াড়দের (PIOs) জাতীয় দলে খেলার ক্ষেত্রে আইনি বিধিনিষেধও ভারতের অগ্রগতিতে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বিশ্ব ফুটবলে ভারতের পিছিয়ে থাকার প্রধান কারণগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
. পরিকাঠামো ও তৃণমূল স্তরে অভাবআন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী ভারতে ফুটবল পরিকাঠামোর অভাব রয়েছে। বেশিরভাগ রাজ্যেই পর্যাপ্ত ফুটবল মাঠ, আধুনিক ট্রেনিং একাডেমি এবং উন্নত জিমের ঘাটতি রয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোর মতো ছোট বয়স থেকে শিশুদের বৈজ্ঞানিক উপায়ে প্রশিক্ষণ দেওয়ার পরিকাঠামো এখনও তৃণমূল স্তরে গড়ে ওঠেনি।
. দুর্বল পরিচালনা ও নীতি (AIFF)সর্বভারতীয় ফুটবল ফেডারেশন (AIFF) প্রায়ই অভ্যন্তরীণ রাজনীতি এবং অব্যবস্থাপনার শিকার হয়। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অভাব এবং সঠিক ট্যালেন্ট হান্ট বা প্রতিভাবান ফুটবলার খুঁজে বের করার কার্যকর সিস্টেম না থাকায় সঠিক প্রতিভাগুলো হারিয়ে যায়।
. কোচিং ও আন্তর্জাতিক এক্সপোজারের অভাবখেলোয়াড়দের আন্তর্জাতিক মানের করে তোলার জন্য দক্ষ ও লাইসেন্সপ্রাপ্ত কোচের সংখ্যা ভারতে অত্যন্ত কম। এছাড়া, ভারতীয় ফুটবলাররা খুব কমই ইউরোপ বা অন্যান্য শক্তিশালী ফুটবল খেলিয়ে দেশের পেশাদার লিগগুলোতে খেলার সুযোগ পান, যার ফলে আন্তর্জাতিক ফুটবলের আগ্রাসী মানসিকতা ও শারীরিক শক্তির সাথে তারা মানিয়ে নিতে পিছিয়ে পড়েন।
. দ্বৈত নাগরিকত্ব ও পিআইও (PIO) নীতিবর্তমানে ভারতীয় বংশোদ্ভূত কোনো খেলোয়াড় (যারা বিদেশে ভালো মানের লিগে খেলছেন) যদি ভারতের হয়ে খেলতে চান, তবে তাকে নিজের বিদেশি পাসপোর্ট ত্যাগ করতে হয়, যা অনেকেই করতে চান না। এই নীতি ভারতের প্রতিভাবান খেলোয়াড়দের পুলকে মারাত্মকভাবে সীমিত করে রেখেছে।
. ক্রিকেটের আধিপত্যভারতে খেলাধুলোর মূল আকর্ষণ এখনও ক্রিকেট। বেশিরভাগ প্রতিভা, কর্পোরেট স্পনসরশিপ এবং মিডিয়া কভারেজ ক্রিকেট কেন্দ্রিক হওয়ায় ফুটবলে বিনিয়োগ ও প্রতিভাদের আকর্ষণ করার ক্ষেত্রে বড় প্রভাব পড়ে।
বিশ্ব ফুটবলের মঞ্চে ভারতের এই পিছিয়ে থাকার কারণ ও উত্তরণের উপায় নিয়ে আলোচনা:
ভারতের বিশ্বকাপে খেলা অসম্ভব নয়। তবে এর কোনো সহজ কোনো রাস্তা নেই।
বাইচুং বলেন, “হ্যাঁ, ভারত অবশ্যই (বিশ্বকাপে) খেলতে পারে, কারণ কোনো কিছুই অসম্ভব নয়। ৪৮ দলের নতুন এবং বড় ফরম্যাটে এশিয়ার কোটা বেড়ে এখন আটটি হয়েছে। সঙ্গে আন্তঃমহাদেশীয় প্লে-অফ জিতে আসা নবম দল হিসেবে ইরাকও এবার খেলছে। উজবেকিস্তান ও জর্ডানের মতো দলগুলো খেলছে। তবে এর জন্য সুন্দর পরিকল্পনা প্রয়োজন।”
ভারতের মতো এত বড় দেশে প্রতিভার কোনো অভাব নেই। তিনি বলেন, “আমাদের যা অভাব তা হলো, একটি সঠিক পরিবেশ বা ‘ইকোসিস্টেম’। কারণ দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা নিয়ে আমাদের তৃণমূল পর্যায়ের কোনো বড় কর্মসূচি নেই। এটি বিশ্বের সবচেয়ে জনপ্রিয় দলীয় খেলা, তাই এর ফলাফল দেখতে আমাদের সময় দিতে হবে।”
আইভরি কোস্ট আর বসনিয়া আগেও বিশ্বকাপ খেলেছে৷ সাড়ে তিন কোটি জনসংখ্যার আইভরি কোস্ট ছোট আকারের দেশ হলেও বিশ্ব ফুটবলে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে৷ আইভরি কোস্ট ২০০৬ সালেই প্রথম বিশ্বকাপ খেলেছে৷
ভারতীয় জাতীয় দলের ডিফেন্ডার প্রীতম কোটাল ডিডাব্লিউকে বলেন, ‘‘আমাদের পরিকাঠামোর ঘাটতি রয়েছে, একথা বলতে পারব না৷ কিন্তু আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ও সঠিক লক্ষ্যে এগোনোর দিকে ঘাটতি রয়েছে৷ ছোট থেকে একটি গাছকে যখন বড় করা হয়, তখন সেটির অনেক ধরনের পরিচর্যা দরকার হয়৷ এক্ষেত্রে আমাদের ঘাটতি রয়েছে৷ ফুটবলারদের ছোট থেকে পরিচর্যা করতে হবে৷’’
আন্তর্জাতিক ফুটবলে ভারতের প্রধান সাফল্যগুলো মূলত ১৯৫০ ও ১৯৬০-এর দশকের স্বর্ণযুগে৷ ১৯৫১ সালে নতুন দিল্লিতে অনুষ্ঠিত প্রথম এশিয়ান গেমসে ইরানকে ১-০ গোলে হারিয়ে ভারত প্রথম স্বর্ণপদক জেতে৷ সেই ইরান এবার বিশ্বকাপ খেলেছে৷