ওড়িশার পুরীর নীচে প্রাচীন শহর, জগন্নাথ মন্দির থেকে সমুদ্র পর্যন্ত ছিল সুড়ঙ্গ

banner

journalist Name : তমজয় শ্রীমানী

#Pravati Sangbad Digital:

ওড়িশার সমুদ্রতীরবর্তী শহর পুরীতে অবস্থিত শ্রী জগন্নাথ মন্দির হিন্দুধর্মের অন্যতম পবিত্র তীর্থস্থান। বিখ্যাত চার ধামের অন্যতম এই মন্দির জগন্নাথ, তাঁর বড় ভাই বলভদ্র এবং বোন সুভদ্রার উদ্দেশে সমর্পিত। গঙ্গা বংশের রাজা অনন্তবর্মণ ১১১২ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ এই মন্দিরের নির্মাণ শুরু করেন। ১১৬১ নাগাদ শেষ হয় মন্দিরের নির্মাণ। মন্দিরটি বেলেপাথরের তৈরি। এই মন্দিরের সবচেয়ে বড় আকর্ষণ হল রথযাত্রা। সারা পৃথিবীর মানুষ জড়ো হন রথযাত্রায় অংশ নিতে।

গঙ্গা রাজবংশ প্রাচীন ও মধ্যযুগীয় ভারতের অন্যতম প্রধান রাজবংশ। এটি দুই ভাগে বিভক্ত ছিল- পূর্ব ও পশ্চিম। এর মধ্যে পূর্ব গঙ্গারাই কলিঙ্গ অঞ্চলের শাসক। বিখ্যাত জগন্নাথ মন্দির নির্মাণ করেছিল এরাই। কোনারকের সূর্য মন্দিরও এদেরই নির্মাণ।

পুরীর জগন্নাথ মন্দিরের চারপাশে মাটির নিচে সুড়ঙ্গের মতো কাঠামোর অস্তিত্বের ইঙ্গিত মিলেছে। এই সুড়ঙ্গটি মন্দির থেকে সমুদ্র পর্যন্ত বিস্তৃত থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। এই প্রাচীন পথটি মন্দিরের ৭৫ মিটারের মধ্যে এবং ৫ মিটার গভীরতায় সনাক্ত করা হয়েছে।

ওড়িশার পবিত্র শহর পুরীর ভূগর্ভে একটি গ্রাউন্ড পেনিট্রেটিং রাডার (GPR) সমীক্ষায় চাঞ্চল্যকর তথ্য উদ্ঘাটিত হয়েছে, যা শহর জুড়ে বিস্তৃত একটি প্রাচীন চাপা পড়া বসতির সম্ভাব্য অস্তিত্বের ইঙ্গিত দেয়। এর মধ্যে শ্রী জগন্নাথ মন্দিরকে সমুদ্রের সাথে সংযোগকারী একটি সন্দেহভাজন ভূগর্ভস্থ সুড়ঙ্গও রয়েছে।

সমীক্ষার ফলাফল: এই সমীক্ষায় এমর মঠ এবং মন্দিরের দক্ষিণ-পূর্ব দিকে সুড়ঙ্গ বা ড্রেনেজ সিস্টেমের মতো কাঠামো পাওয়া গেছে, যা প্রাচীন শহরের অংশ হতে পারে।

 জগন্নাথ হেরিটেজ করিডোর প্রকল্পের (Jagannath Heritage Corridor Project) কাজের সময় ২০২২ সালে এমর মঠের কাছে একটি ভাঙা সিংহমূর্তি পাওয়ার পর ওড়িশা ব্রিজ কনস্ট্রাকশন কর্পোরেশন (OBCC) এই সমীক্ষা চালায়।

ঐতিহাসিক গুরুত্ব: এই ধরণের সুড়ঙ্গ প্রাচীনকালে গোপন যাতায়াত বা জল নিষ্কাশনের জন্য ব্যবহৃত হতো। 

শ্রীমন্দির পরিক্রমা প্রকল্প’ চলাকালীন শ্রমিকরা এক প্রাচীন সিংহমূর্তির সন্ধান পান। যা দেখে প্রত্নতাত্ত্বিকরা দাবি করেছিলেন, ওই নিদর্শন শক্তিশালী গঙ্গা রাজবংশের আমলের। আর তারপরই এই অত্যাধুনিক সমীক্ষার নির্দেশ দেওয়া হয়। বলে রাখা ভালো, জিপিআর হল এমন এক সমীক্ষা যাতে তড়িচ্চুম্বকীয় তেজস্ক্রিয়তাকে কাজে লাগিয়ে মাটির নিচে ধাতব/অধাতব বস্তুর সন্ধান করা হয়।

শ্রীমন্দির পরিক্রমা প্রকল্পের খননকার্য চলাকালে গঙ্গা রাজবংশের আমলের সিংহ ভাস্কর্যসহ বিভিন্ন প্রত্নবস্তু আবিষ্কৃত হওয়ার পর এই সমীক্ষা শুরু করা হয়। সর্বশেষ প্রতিবেদন থেকে জানা যায় যে, ঐতিহাসিক ধ্বংসাবশেষ শুধু মন্দিরের আশপাশেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং শহরের নিচে আরও বিস্তৃত এলাকা জুড়ে ছড়িয়ে রয়েছে।

তবে, এই বিষয়ে আরও গভীরে পরীক্ষা-নিরীক্ষা প্রয়োজন বলে জানিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা।

প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, মন্দির থেকে সমুদ্র পর্যন্ত একটি সুড়ঙ্গের মতো কাঠামো থাকতে পারে। এছাড়াও, ২১.৬ বর্গমিটার এলাকা জুড়ে কাঠামোগত ধ্বংসাবশেষ শনাক্ত করা হয়েছে। এমার মঠ, নৃসিংহ মন্দির, বুধি মা মন্দির এবং জগন্নাথ মন্দিরের সংযোগকারী রাস্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ স্থানগুলিতে মোট ৪৩টি ঐতিহ্যবাহী স্থান চিহ্নিত করা হয়েছে।

জানা যাচ্ছে, ভূগর্ভে যে ধ্বংসাবশেষ পাওয়া গিয়েছে, তা মোটেই কেবলমাত্র মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলেই আবদ্ধ নয়। বরং গোটা পুরী জুড়েই ওই নগরী বিস্তৃত ছিল বলেই মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা। এমার মঠ, নৃসিংহ মন্দির, বুড়ি মা মন্দির ও তৎসংলগ্ন রাস্তা- সব মিলিয়ে ৪৩টি অঞ্চলে প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন ছড়িয়ে রয়েছে বলে গবেষকদের দাবি।

সমীক্ষায় মাটির নিচে চাপা পড়া মৃৎপাত্র, ধাতব বস্তু এবং অন্যান্য নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর উপস্থিতিরও ইঙ্গিত পাওয়া গেছে। শহরের এই লুকানো ঐতিহ্য রক্ষার জন্য বিশেষজ্ঞরা এই প্রত্নবস্তুগুলোর নিয়ন্ত্রিত খনন ও সংরক্ষণের সুপারিশ করেছেন।

এর আগে, জিপিআর জরিপ ছাড়াই প্রাথমিক খননের সময় ভারী যন্ত্রপাতির আঘাতে দুটি সিংহের ভাস্কর্য ক্ষতিগ্রস্ত হয়, যা বিতর্কের জন্ম দেয়। পরবর্তীতে ভারতীয় প্রত্নতাত্ত্বিক জরিপ বিভাগ (এএসআই) স্থানটি পরীক্ষা করে নিশ্চিত করে যে ভাস্কর্যগুলো এবং ৩০ ফুট দীর্ঘ একটি প্রাচীর গঙ্গা রাজবংশের অন্তর্গত। ৭.৬ মিটার দৈর্ঘ্য ও ৩ মিটার প্রস্থের একটি কক্ষও শনাক্ত করা হয়েছিল, যদিও এরপর আর খননকাজ চালানো হয়নি। গবেষকরা তখন ধারণা করেছিলেন যে এই কাঠামোটিতে সোনার মূর্তির পূজা করা হয়ে থাকতে পারে।

অভিযোগ উঠেছে যে, পরিক্রমা প্রকল্পের প্রাথমিক পর্যায়ে বৈজ্ঞানিক জরিপ পদ্ধতির অভাবে বেশ কিছু প্রাচীন প্রত্নবস্তু ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বা হারিয়ে গেছে।

পরবর্তীকালে, মন্দির প্রশাসন ওবিসিসি-র মাধ্যমে ৪০ লক্ষ টাকা ব্যয়ে একটি জিপিআর সমীক্ষার ব্যবস্থা করে, যা আইআইটি গান্ধীনগর দ্বারা পরিচালিত হয়েছিল। তবে, প্রতিবেদনটির প্রাপ্যতা নিয়ে বিভ্রান্তি দেখা দেয়। মন্দির প্রশাসন যেখানে প্রতিবেদনটি না পাওয়ার দাবি করে, সেখানে আইআইটি গান্ধীনগর জানায় যে তারা তাদের পর্যবেক্ষণ জমা দিয়েছে। ওবিসিসি পরে জানায় যে জমা দেওয়া প্রতিবেদনটি অসম্পূর্ণ ছিল।

তথ্য অধিকার আইনের অধীনে বিস্তারিত তথ্য চেয়ে আইনজীবী দিলীপ বারাল অবশেষে তথ্য কমিশনের নির্ধারিত শুনানির আগেই প্রতিবেদনটি পেয়েছেন। তিনি প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে বৈজ্ঞানিক খনন ও সংরক্ষণের জন্য অবিলম্বে পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।

এই মন্দিরের চারটি দ্বার- উত্তর দ্বার,দক্ষিণ দ্বার,পূর্ব দ্বার ও পশ্চিম দ্বার। এর মধ্যে উত্তর দিকের দরজাটি হস্তীদ্বার। দক্ষিণ দিকের দরজা অশ্বদ্বার। পশ্চিম দিকের দরজা ব্যাঘ্র দ্বার। পূর্ব দিকের দরজা সিংহদ্বার। মন্দিরের গোপন কক্ষে রয়েছে সাতটি ঘর, যা রত্নভাণ্ডার নামে পরিচিত।

পুরী মন্দিরকে ঘিরে রহস্যের কুয়াশা রয়ে গিয়েছে আজও। মন্দিরের চূড়ার পতাকা সবসময় বাতাসের বিপরীত দিকে ওড়ে কিংবা এবং মন্দিরের ঠিক উপর দিয়ে কোনও পাখি বা বিমান উড়ে না—এমনই নানা মিথ রয়েছে। এবার নতুন রহস্য ঘনাল মাটির নিচে সন্ধান মেলা প্রাচীন নগরীকে ঘিরে।

Related News